শুরুর কথা
আপনি এবং আপনার সঙ্গী হয়তো অনেক দিন ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছেন? এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো শুক্রাণুর স্বাস্থ্য। অনেক পুরুষই জানেন না, তাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস নীরবে শুক্রাণুর মান কমিয়ে দিচ্ছে।
আজকের লেখায় আমরা সেই ৭টি সাধারণ ভুল নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো আপনি হয়তো না জেনেই করছেন। এই অভ্যাসগুলো বাদ দিলে আপনার সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন, প্রতিটি শরীর আলাদা। তাই কোনো সমস্যা থাকলে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
১. ধূমপান ও তামাক সেবন
ধূমপান শুধু ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি আপনার শুক্রাণুর জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। সিগারেটের মধ্যে থাকা নিকোটিন এবং অন্যান্য রাসায়নিক শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে, শুক্রাণুর সংখ্যা কমায় এবং তাদের চলাচলের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
আপনি যদি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাহলে আজই ধূমপান ছেড়ে দিন। এছাড়া জর্দা, গুল, তামাক সেবনও বাদ দিন। গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান ছাড়ার ৩ মাসের মধ্যে শুক্রাণুর মান উন্নত হতে শুরু করে।
২. অতিরিক্ত মদ্যপান
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা শুক্রাণু তৈরির জন্য অপরিহার্য। মদ্যপানের ফলে শুক্রাণুর আকার ও গঠনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আপনি যদি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাহলে মদ পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই ভালো। মাঝে মাঝে এক গ্লাস হয়তো সমস্যা নয়, কিন্তু নিয়মিত মদ্যপান আপনার গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
৩. টাইট আন্ডারওয়্যার ও গরম পরিবেশ
শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রা প্রয়োজন। টাইট আন্ডারওয়্যার বা জিন্স পরলে অণ্ডকোষ শরীরের কাছাকাছি চলে আসে, ফলে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত তাপ শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা দেয়।
ঢিলেঢালা সুতির আন্ডারওয়্যার পরুন এবং ল্যাপটপ কোলে রেখে কাজ করা, গরম পানিতে দীর্ঘ সময় গোসল করা, সওনা বাথ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এই ছোট ছোট পরিবর্তন আপনার শুক্রাণুর জন্য বড় উপকার বয়ে আনতে পারে।
৪. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
যা খান, তা আপনার শুক্রাণুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত পানীয় এবং ট্রান্স ফ্যাট শুক্রাণুর মান খারাপ করে। অন্যদিকে, ফল, শাকসবজি, বাদাম, মাছ এবং পর্যাপ্ত পানি শুক্রাণুকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
প্রতিদিনের খাবারে জিংক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। যেমন: কুমড়ার বীজ, ডালিম, আখরোট, পালং শাক, কমলা ইত্যাদি। তবে কোনো সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৫. অতিরিক্ত মানসিক চাপ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ আপনার শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেড়ে গেলে টেস্টোস্টেরন কমে যায়, যার ফলে শুক্রাণুর সংখ্যা ও মান উভয়ই কমে যায়।
সন্তান নেওয়ার চেষ্টা নিজেই অনেক সময় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই চেষ্টা করুন রিল্যাক্স থাকতে। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেশন বা আপনার পছন্দের শখের কাজে সময় দিন। প্রয়োজনে সঙ্গীর সাথে কথা বলে মানসিক চাপ ভাগ করে নিন।
৬. মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার
মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন শুক্রাণুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্যান্টের পকেটে ফোন রাখলে অণ্ডকোষের কাছে রেডিয়েশন পৌঁছায়, যা শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
চেষ্টা করুন ফোনটি প্যান্টের পকেটে না রেখে ব্যাগে বা অন্য জায়গায় রাখতে। রাতে ঘুমানোর সময় ফোনটি দূরে রাখুন। এছাড়া ল্যাপটপও কোলে না রেখে টেবিলে রেখে ব্যবহার করুন।
৭. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
শরীরের প্রতিটি কোষ মেরামত ও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য ঘুম অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা শুক্রাণু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি মেনে চললে আপনার শরীর ভালো থাকবে, আর শুক্রাণুও হবে সুস্থ।
শেষ কথা
সন্তান নেওয়ার চেষ্টা একটি সুন্দর যাত্রা। এই যাত্রায় আপনার শরীরের যত্ন নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। উপরের ৭টি অভ্যাস বাদ দিলে আপনার শুক্রাণুর স্বাস্থ্য অনেকটাই উন্নত হবে, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।
তবে মনে রাখবেন, শুক্রাণুর সমস্যা ছাড়াও গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন আরও অনেক কারণ আছে। তাই ১ বছরের চেষ্টার পরও যদি সন্তান না হয়, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তারই আপনার জন্য সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দিতে পারবেন।