বেলস পলসি হলে করণীয়, পরীক্ষা ও চিকিৎসা — CloudRx Blog | CloudRx
বেলস পলসি হলে করণীয়, পরীক্ষা ও চিকিৎসা
Health Tips Aug 28, 2026 · CloudRx Team

বেলস পলসি হলে করণীয়, পরীক্ষা ও চিকিৎসা

বেলস পলসি হলে কী করবেন, কী কী পরীক্ষা করাবেন এবং কখন ডাক্তার দেখাবেন, তা সহজ ভাষায় জেনে নিন।

বেলস পলসি কী?

বেলস পলসি (Bell's Palsy) হলো মুখের স্নায়ুর (ফেসিয়াল নার্ভ) একটি সমস্যা, যার কারণে মুখের এক পাশ হঠাৎ করে দুর্বল হয়ে যায় বা অবশ হয়ে যায়। এটি সাধারণত এক পাশের মুখকে প্রভাবিত করে, ফলে হাসতে, চোখ বন্ধ করতে বা ভ্রু কুঁচকাতে সমস্যা হয়। এটি কোনো স্থায়ী প্যারালাইসিস নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সেরে ওঠা যায়।

বেলস পলসি সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ফেসিয়াল নার্ভে প্রদাহের কারণে হয়। এটি যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবে ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

বেলস পলসির লক্ষণগুলো কী কী?

বেলস পলসি সাধারণত হঠাৎ করেই দেখা দেয়। লক্ষণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • মুখের এক পাশ ঝুলে পড়া বা দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে না পারা
  • হাসতে গেলে মুখ বেঁকে যাওয়া
  • কপালে ভাঁজ পড়ে না
  • খাবার বা পানীয় মুখ থেকে পড়ে যাওয়া
  • কানের পেছনে বা চোয়ালে ব্যথা
  • আক্রান্ত পাশে স্বাদ নিতে সমস্যা
  • অতিরিক্ত লালা পড়া

লক্ষণগুলো সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। অনেক সময় আক্রান্ত পাশের চোখ শুকিয়ে যেতে পারে, কারণ চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

বেলস পলসি হলে প্রথমে কী করবেন?

বেলস পলসির লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারেন। মনে রাখবেন, এটি সাধারণত স্ট্রোক নয়, তবে স্ট্রোকের লক্ষণের সাথে মিল থাকায় দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ঘরোয়া যত্ন

  • চোখের সুরক্ষা: আক্রান্ত পাশের চোখ বন্ধ না হলে কৃত্রিম চোখের জল (লুব্রিকেটিং আই ড্রপ) ব্যবহার করুন। রাতে ঘুমানোর সময় চোখে প্যাচ বা চোখ বাঁধার ব্যান্ড ব্যবহার করতে পারেন।
  • মুখের ব্যায়াম: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মুখের পেশি সচল রাখতে হালকা ব্যায়াম করতে পারেন, যেমন হাসা, ভ্রু তোলা, গাল ফোলানো ইত্যাদি। তবে অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
  • গরম সেঁক: আক্রান্ত পাশে হালকা গরম সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়।
  • পুষ্টিকর খাবার: নরম ও সহজে চিবানো যায় এমন খাবার খান। চিবানোর সময় সুস্থ পাশ দিয়ে চিবানোর চেষ্টা করুন।
  • বিশ্রাম: পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

বেলস পলসির লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নিচের অবস্থাগুলোতে দেরি না করে ডাক্তার দেখান:

  • মুখের দুর্বলতা ছাড়াও হাত-পা দুর্বল হলে
  • কথা বলতে সমস্যা হলে
  • দৃষ্টি ঝাপসা হলে বা দ্বিগুণ দেখা গেলে
  • মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারালে
  • তীব্র মাথাব্যথা থাকলে
  • লক্ষণ ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরও বাড়তে থাকলে

এসব ক্ষেত্রে বেলস পলসি ছাড়াও স্ট্রোক বা অন্য কোনো স্নায়ুর সমস্যা থাকতে পারে, তাই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

কী কী পরীক্ষা করতে হবে?

বেলস পলসি নির্ণয়ের জন্য সাধারণত কিছু পরীক্ষা করা হয়। ডাক্তার প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করবেন এবং রোগীর লক্ষণ সম্পর্কে জানবেন। প্রয়োজনে নিচের পরীক্ষাগুলো করতে বলতে পারেন:

  • ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি (EMG): এই পরীক্ষার মাধ্যমে মুখের স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং পেশির সাড়া পরীক্ষা করা হয়। এটি স্নায়ুর ক্ষতির মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে।
  • নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি: এই পরীক্ষায় স্নায়ু দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত কত দ্রুত যায় তা মাপা হয়।
  • রক্ত পরীক্ষা: ডায়াবেটিস, সংক্রমণ বা অন্য কোনো রোগ আছে কিনা তা জানতে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
  • এমআরআই বা সিটি স্ক্যান: মস্তিষ্কের টিউমার, স্ট্রোক বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা তা বাদ দিতে এই ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজন নয়।

মনে রাখবেন, বেলস পলসির কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই। ডাক্তার রোগীর লক্ষণ দেখে এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ বাদ দিয়ে এই রোগ নির্ণয় করেন।

চিকিৎসা কীভাবে হয়?

বেলস পলসির চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর অবস্থার উপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ওষুধ

  • স্টেরয়েড: স্নায়ুর প্রদাহ কমাতে প্রেডনিসোলন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। লক্ষণ শুরু হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
  • অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হলে অ্যাসাইক্লোভির জাতীয় ওষুধ দেওয়া হতে পারে।
  • ব্যথানাশক: ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন দেওয়া হয়।

ওষুধ সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়।

ফিজিওথেরাপি

মুখের পেশি সচল রাখতে এবং দুর্বলতা কাটাতে ফিজিওথেরাপি খুবই কার্যকর। বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট মুখের ব্যায়াম, ম্যাসাজ এবং বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা (ইলেকট্রিক স্টিমুলেশন) দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন।

অন্যান্য চিকিৎসা

কিছু ক্ষেত্রে চোখের সুরক্ষার জন্য চোখের ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থাকলে প্লাস্টিক সার্জারি বা কসমেটিক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে, তবে এটি বিরল।

সেরে উঠতে কত সময় লাগে?

বেশিরভাগ রোগী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সেরে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ৯ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রায় ৮০% রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান, বাকিদের মধ্যে সামান্য দুর্বলতা থেকে যেতে পারে।

চিকিৎসা শুরু করতে যত দেরি হবে, সেরে উঠতে তত বেশি সময় লাগতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বেলস পলসি প্রতিরোধের উপায়

বেলস পলসি প্রতিরোধের কোনো নির্দিষ্ট উপায় নেই, কারণ এটি সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়। তবে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্য টিপস মেনে চললে ঝুঁকি কমানো যায়:

  • পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রাম নিন
  • মানসিক চাপ কমান
  • সুষম খাবার খান এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান
  • ঠান্ডা লাগা বা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সতর্ক থাকুন
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন

শেষ কথা

বেলস পলসি একটি ভীতিকর অভিজ্ঞতা হতে পারে, কিন্তু মনে রাখবেন এটি সাধারণত সাময়িক সমস্যা এবং সঠিক চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান এবং ডাক্তারের দেওয়া চিকিৎসা মেনে চলুন। ধৈর্য ধরুন, কারণ সেরে উঠতে সময় লাগতে পারে।

এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Share this article: