ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যাতে শরীরের রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা বেড়ে যায়। এটি তখন ঘটে যখন শরীর যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করে না, বা তৈরি করলেও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন হলো একটি হরমোন যা খাবার থেকে পাওয়া শর্করাকে কোষে পৌঁছে দেয়, যাতে শরীর তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এই গাইডে আমরা সহজ বাংলায় আলোচনা করব বাড়িতে কীভাবে পরীক্ষা করবেন, ল্যাবে কী কী পরীক্ষা করবেন, টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পার্থক্য, এবং কখন ডাক্তার দেখাবেন।
বাড়িতে ডায়াবেটিস পরীক্ষা (হোম টেস্ট)
বাড়িতে রক্তে শর্করা মাপার জন্য সাধারণত একটি গ্লুকোমিটার ব্যবহার করা হয়। এটি একটি ছোট যন্ত্র, যা আঙুলের ডগা থেকে এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিডিং দেয়। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য নিয়মিত হোম টেস্ট খুবই উপকারী।
বাড়িতে পরীক্ষা করার সময় কিছু বিষয় মনে রাখবেন:
- সকালে খালি পেটে (ফাস্টিং) এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে পরীক্ষা করা সাধারণত বেশি কার্যকর।
- পরীক্ষার আগে হাত ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন, যাতে রক্তের নমুনা সঠিক হয়।
- প্রতিবার পরীক্ষার ফলাফল একটি ডায়েরিতে লিখে রাখুন, যাতে ডাক্তার দেখতে পারেন।
- গ্লুকোমিটার এবং টেস্ট স্ট্রিপের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ব্যবহার করবেন না।
বাড়িতে পরীক্ষা করলে দ্রুত জানা যায় আপনার শর্করা মাত্রা কেমন আছে, তবে এটি ল্যাব পরীক্ষার বিকল্প নয়। নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষাও করা দরকার।
ল্যাবে কী কী পরীক্ষা করবেন
ডায়াবেটিস নির্ণয় বা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডাক্তার কিছু নির্দিষ্ট ল্যাব পরীক্ষা দিতে পারেন। সাধারণত এই পরীক্ষাগুলো করা হয়:
- ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS): রাতের খাবারের পর ৮-১০ ঘণ্টা না খেয়ে সকালে রক্ত পরীক্ষা। স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত ৭০-১০০ mg/dL (মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার) এর মধ্যে থাকে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বুঝবেন।
- HbA1c (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন): এটি গত ২-৩ মাসের গড় শর্করা মাত্রা দেখায়। এটি ৫.৭% এর কম হলে স্বাভাবিক, ৫.৭-৬.৪% হলে প্রি-ডায়াবেটিস, এবং ৬.৫% বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস ধরা হয়। ডাক্তার এই ফলাফল দেখে চিকিৎসা ঠিক করেন।
- ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT): খালি পেটে প্রথমে রক্ত নেওয়া হয়, তারপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনির দ্রবণ পান করিয়ে ২ ঘণ্টা পর আবার রক্ত নেওয়া হয়। এটি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
- রেন্ডম ব্লাড সুগার: খাবার খাওয়ার সময় নির্বিশেষে যেকোনো সময় রক্ত পরীক্ষা। ২০০ mg/dL এর বেশি হলে ডায়াবেটিসের লক্ষণ থাকতে পারে।
এছাড়া ডাক্তার কিডনি, চোখ, বা স্নায়ুর সমস্যা আছে কিনা দেখতে অন্যান্য পরীক্ষাও দিতে পারেন।
টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পার্থক্য
ডায়াবেটিস প্রধানত দুই ধরনের: টাইপ ১ এবং টাইপ ২। এদের কারণ এবং চিকিৎসা কিছুটা ভিন্ন।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস
টাইপ ১ সাধারণত শিশু বা তরুণ বয়সে শুরু হয়। এই ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন তৈরি করা কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর একদম ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। তাই টাইপ ১ রোগীদের প্রতিদিন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। এটি ইনসুলিন-নির্ভর ডায়াবেটিস নামেও পরিচিত।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস
টাইপ ২ সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে এখন কম বয়সীদের মধ্যেও হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করে না, বা তৈরি করলেও তা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স)। অনেক সময় মুখে খাওয়ার ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে পরবর্তী পর্যায়ে ইনসুলিনও লাগতে পারে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে স্থূলতা, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং বংশগত কারণ জড়িত।
টাইপ ১ এবং টাইপ ২ এর মধ্যে মূল পার্থক্য হলো ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা। টাইপ ১ এ শরীর একদম ইনসুলিন তৈরি করে না, তাই বাইরে থেকে নিতে হয়। টাইপ ২ এ শরীর কিছু ইনসুলিন তৈরি করে, কিন্তু তা কাজে লাগে না।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
যদি আপনার নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন:
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা পানি পিপাসা
- অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা
- ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- ঝাপসা দৃষ্টি
- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
- হাত বা পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা বা অবশ লাগা
এছাড়া যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের নিয়মিত ফলোআপ করা জরুরি। ডাক্তার ঠিক করবেন কতদিন পর পর পরীক্ষা করতে হবে। সাধারণত প্রতি ৩-৬ মাসে HbA1c পরীক্ষা করা হয়। তবে আপনার ডাক্তারের পরামর্শই সবচেয়ে ভালো।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কিছু সহজ টিপস
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু অভ্যাস গড়ে তুলুন:
- সুষম খাবার খান, বিশেষ করে শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার এবং পুরো শস্য।
- মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন, যেমন হাঁটা, সাঁতার বা সাইকেল চালানো। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন, যেমন মেডিটেশন বা শখের কাজ।
মনে রাখবেন, এই টিপসগুলো সাধারণ পরামর্শ। আপনার জন্য কী উপযুক্ত, তা জানতে অবশ্যই একজন যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সতর্কতা
এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র তথ্য প্রদানের জন্য। কোনো রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। নিজে নিজে ওষুধ বা ইনসুলিনের ডোজ পরিবর্তন করবেন না।