বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহ এখন প্রায় নিত্যসঙ্গী। প্রচণ্ড গরমে শরীর যেমন ক্লান্ত হয়, তেমনি বাড়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং যারা বাইরে কাজ করেন, তাদের জন্য এই সময়টা বেশি কষ্টের। তবে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে তাপপ্রবাহের মধ্যেও সুস্থ থাকা সম্ভব। আসুন জেনে নিই দিনে, লোডশেডিংয়ের সময় এবং রাতে কী কী সতর্কতা নেবেন।
দিনের বেলায় করণীয়
দিনের বেলা যখন সূর্য মাথার ওপর, তখন শরীর সবচেয়ে বেশি হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকে। তাই এই সময়ে কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দিন।
- প্রচুর পানি পান করুন: গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। তাই দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। পিপাসা না লাগলেও কিছুক্ষণ পরপর পানি খান।
- হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন: সুতি বা হালকা রঙের কাপড় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। টাইট বা মোটা কাপড় এড়িয়ে চলুন।
- সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলুন: সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন। জরুরি কাজে বের হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন।
- ঘর ঠান্ডা রাখুন: দিনের বেলা ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখুন এবং পর্দা টেনে দিন। এতে বাইরের গরম বাতাস ঢুকতে পারবে না।
- হালকা খাবার খান: ভারী ও তৈলাক্ত খাবারের বদলে ফল, সালাদ, দই, লেবুর শরবত জাতীয় হালকা খাবার খান। এগুলো শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
যদি মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন, তবে দ্রুত ছায়ায় বা ঠান্ডা জায়গায় বিশ্রাম নিন। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
লোডশেডিংয়ের সময় করণীয়
লোডশেডিং মানেই ঘরে বাতাস নেই, গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। কিন্তু কিছু কৌশল অবলম্বন করলে এই সময়ও সহনীয় করা যায়।
- ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছুন: লোডশেডিংয়ের সময় ভেজা কাপড় দিয়ে মুখ, ঘাড় ও গলা মুছে নিন। এটি শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে সাহায্য করে।
- বাড়ির নিচতলায় থাকুন: সম্ভব হলে বাড়ির নিচতলা বা মেঝেতে থাকুন। উপরের তলাগুলো বেশি গরম হয়।
- কাগজের পাখা ব্যবহার করুন: হাতে বা ব্যাটারিচালিত পাখা ব্যবহার করুন। এতে বাতাস চলাচল হবে এবং কিছুটা স্বস্তি মিলবে।
- ঠান্ডা পানীয় প্রস্তুত রাখুন: লোডশেডিংয়ের আগেই ফ্রিজে ঠান্ডা পানি, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত রেখে দিন। বন্ধ বিদ্যুতে ফ্রিজ না খুলে রাখুন, যেন ঠান্ডা থাকে।
- বাইরের গরম বাতাস ঢুকতে দেবেন না: লোডশেডিংয়ের সময় জানালা খুলে রাখলেও রোদ যেন সরাসরি না ঢোকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
লোডশেডিং দীর্ঘ হলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঝে মাঝে ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে পারেন। তবে হঠাৎ খুব ঠান্ডা পানিতে গোসল এড়িয়ে চলাই ভালো।
রাতে করণীয়
রাতের বেলা তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ঘরে গরম জমে থাকার কারণে ঘুমাতে অসুবিধা হয়। রাতে ভালো ঘুম ও সুস্থ থাকতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলুন।
- ঘুমানোর আগে গরম পানি দিয়ে পা ধুয়ে নিন: এটি শরীর ঠান্ডা করতে এবং ঘুম আনতে সাহায্য করে।
- হালকা চাদর ব্যবহার করুন: মোটা কম্বল বা ভারী চাদরের বদলে হালকা সুতি চাদর ব্যবহার করুন।
- ঘরে বাতাস চলাচল করুন: রাতে জানালা খুলে রাখুন, যাতে বাতাস ঢুকতে পারে। তবে মশারি ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
- ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাবেন না: রাতে হালকা খাবার খান এবং ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করুন।
- বৈদ্যুতিক পাখা বা কুলার ব্যবহার করুন: বিদ্যুৎ থাকলে পাখা বা কুলার চালিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখুন। তবে সরাসরি গায়ে বাতাস না লাগিয়ে ঘুরিয়ে রাখুন।
রাতে ঘুম না এলে চিন্তা করবেন না। কিছুক্ষণ ছাদে বা বারান্দায় বসে ঠান্ডা বাতাস নিন। তবে রাতে বাইরে বের হলে সতর্ক থাকুন।
তাপপ্রবাহে বিশেষ সতর্কতা
শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দিন। তাদের শরীর দ্রুত গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে বারবার পানি খাওয়ান এবং ঘরের ঠান্ডা জায়গায় রাখুন। যারা বাইরে কাজ করেন, তারা দিনে কিছুক্ষণ পরপর ছায়ায় বিশ্রাম নিন।
তাপপ্রবাহের সময় নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়া খুবই জরুরি। এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চললে গরমের কষ্ট অনেকটাই কমবে। তবে যদি কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়া, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।