হিট স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যখন ব্যর্থ হয়ে যায়, তখনই ঘটে হিট স্ট্রোক। এটি একটি মারাত্মক অবস্থা, যেখানে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে এখন এই সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
সাধারণত দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, যথেষ্ট পানি না খাওয়া, এবং অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করার কারণে হিট স্ট্রোক হয়। যাদের বয়স বেশি, ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী এবং যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস বা হার্টের সমস্যা আছে, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো কী কী?
হিট স্ট্রোক আসার আগে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন:
- মাথা ঘোরা বা মাথা ব্যথা
- অতিরিক্ত গরম লাগা কিন্তু ঘাম না হওয়া
- ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যাওয়া
- দুর্বল লাগা বা ক্লান্তি
- বমি বমি ভাব বা বমি
- দ্রুত হৃদস্পন্দন
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
যদি এই লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দেয়, তবে দেরি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
হিট স্ট্রোক হলে সাথে সাথে কী করবেন?
হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিচের কাজগুলো দ্রুত করুন:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাথে সাথে রোদ থেকে ছায়ায় বা ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান।
- তার শরীরের অতিরিক্ত কাপড় খুলে দিন এবং শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালুন বা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিন।
- Battery চালিত বা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করুন।
- যদি তিনি সচেতন থাকেন, তবে তাকে ঠান্ডা পানি বা ওরাল স্যালাইন পান করতে দিন।
- যদি অজ্ঞান হয়ে যান, তবে তাকে এক পাশে কাত করে শুইয়ে দিন এবং মুখ পরিষ্কার রাখুন।
- যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
মনে রাখবেন, হিট স্ট্রোক একটি জরুরি অবস্থা, তাই শুধু ঘরোয়া চিকিৎসায় সন্তুষ্ট না থেকে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
হিট স্ট্রোকের জন্য কী কী পরীক্ষা করা হয়?
হাসপাতালে ডাক্তাররা সাধারণত কিছু পরীক্ষা করে থাকেন:
- শরীরের তাপমাত্রা মাপা
- রক্ত পরীক্ষা (ইলেকট্রোলাইট, ক্রিয়েটিনিন, লিভার ফাংশন)
- প্রস্রাব পরীক্ষা
- ইসিজি (ECG) হার্টের কার্যকারিতা দেখতে
- প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই
এই পরীক্ষাগুলো করে ডাক্তার বুঝতে পারেন যে হিট স্ট্রোকের কারণে শরীরের ভেতরে কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করেন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
সাধারণত গরমে একটু দুর্বল লাগলে ঘরেই বিশ্রাম নেওয়া যায়। কিন্তু যদি নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান:
- শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি
- মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- বমি করা
- খুব দুর্বল লাগা বা হাঁটতে না পারা
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- খিঁচুনি হওয়া
এছাড়া যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি সমস্যা আছে, তারা হিট স্ট্রোকের সামান্য লক্ষণেও ডাক্তার দেখাবেন।
গরমে হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার কিছু সহজ উপায়
প্রতিরোধ সবসময়ই ভালো। তাই গরমে এই বিষয়গুলো মেনে চলুন:
- প্রচুর পানি পান করুন। বাইরে গেলে সাথে একটি পানির বোতল রাখুন।
- রোদে বের হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন।
- হালকা, ঢিলেঢালা এবং সুতির কাপড় পরুন।
- দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে রোদে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন।
- Battery চালিত বা হাতপাখা সাথে রাখুন, প্রয়োজনে ব্যবহার করুন।
- গরমে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করা থেকে বিরত থাকুন।
- যদি অসুস্থ বোধ করেন, তবে সাথে সাথে ছায়ায় বা ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে কিছুক্ষণ বসুন বা শুয়ে পড়ুন।
এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো মেনে চললে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
বিশেষ সতর্কতা
শিশু এবং বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন, কারণ তারা নিজেরা বুঝে উঠতে পারে না। গরমে তাদের বারবার পানি খাওয়ান এবং ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। যারা রিকশাচালক, শ্রমিক বা রাস্তায় কাজ করেন, তারা যেন পর্যাপ্ত পানি পান করেন এবং মাঝে মাঝে ছায়ায় বিশ্রাম নেন।
মনে রাখবেন, হিট স্ট্রোক একটি প্রাণঘাতী অবস্থা, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। সবসময় নিজের শরীরের কথা শুনুন এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।