ব্যাকটেরিয়া দিয়ে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা — CloudRx Blog | CloudRx
ব্যাকটেরিয়া দিয়ে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা
News Sep 03, 2026 · CloudRx Team

ব্যাকটেরিয়া দিয়ে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা

জাপানি ব্যাঙের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া কোলোরেক্টাল ক্যান্সার নিরাময়ে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, জানুন কীভাবে।

একটি অদ্ভুত উৎস থেকে নতুন আশা

কল্পনা করুন, একটি ছোট সবুজ ব্যাঙের পেটের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া হয়তো একদিন ক্যান্সার রোগীদের বাঁচাতে পারে। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ঠিক এমনই এক আশার খবর পাওয়া গেছে। জাপানের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জাপানি গাছের ব্যাঙের অন্ত্রে থাকা এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়া কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের (মলাশয় বা কোলন ও রেকটামের ক্যান্সার) চিকিৎসায় প্রচলিত পদ্ধতির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।

ক্যান্সার চিকিৎসার জগতে এটা যেন এক নতুন দিগন্ত। আসুন, এই গবেষণাটি সম্পর্কে সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।

গবেষণাটি কী বলছে?

জাপানের জাপান অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (JAIST) একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। তাঁরা জাপানি গাছের ব্যাঙ, জাপানি ফায়ার বেলি নিউট এবং জাপানি ঘাসের টিকটিকির অন্ত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান, সেখানে কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে যেগুলোর ক্যান্সার বিরোধী ক্ষমতা থাকতে পারে।

তাঁরা মোট নয়টি ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেন খুঁজে পান যেগুলোর টিউমারের বিরুদ্ধে কাজ করার সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে Ewingella americana নামের ব্যাকটেরিয়াটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এই ব্যাকটেরিয়া?

গবেষকরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, এই ব্যাকটেরিয়া দুটি উপায়ে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

  • প্রথমত, এটি সরাসরি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে।
  • দ্বিতীয়ত, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে, যাতে শরীর নিজেই অ্যাপোপটোসিস বা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চালাতে পারে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ব্যাকটেরিয়া টিউমার টিস্যুতেই জমা থাকে এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে না। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি অনেক কম।

ফলাফল কী ছিল?

গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরের শরীরে একবার মাত্র এই ব্যাকটেরিয়া ইনজেকশনের মাধ্যমে দিলে টিউমার সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায়। অর্থাৎ, ১০০% ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সাড়া মিলেছে। এই ফলাফল সাধারণ কেমোথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির চেয়েও অনেক ভালো।

তাছাড়া, কেমোথেরাপির যে ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, যেমন চুল পড়া, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি ইত্যাদি, এই ব্যাকটেরিয়া সেগুলো ঘটায় না। গবেষকরা বলছেন, এর নিরাপত্তা প্রোফাইল খুবই ভালো। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়া রক্ত থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শরীরের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ। শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর প্রায় ১৫০,০০০ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। আগে মনে করা হতো, এই রোগ প্রধানত বয়স্কদের হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অল্পবয়সীদের মধ্যে এই রোগের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে মাত্র ১১% রোগী ৫৫ বছরের কম বয়সী ছিলেন, যা ২০১৯ সালে বেড়ে ২০% হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি না বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাই নতুন এবং কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতির খুবই প্রয়োজন।

সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

তবে মনে রাখতে হবে, এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা। ইঁদুরের ওপর সফল হলেও মানুষের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে, তা জানতে আরও অনেক গবেষণা দরকার। গবেষকরা এখন এই ব্যাকটেরিয়া অন্য ধরনের ক্যান্সার, যেমন স্তন ক্যান্সার এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে কাজ করে কি না, তা নিয়েও পরীক্ষা করবেন।

তাছাড়া, ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগের আরও নিরাপদ এবং কার্যকর পদ্ধতি খোঁজা হচ্ছে। গবেষকরা দেখতে চান, এই থেরাপি প্রচলিত ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে একসঙ্গে দেওয়া যায় কি না।

সবশেষে

প্রকৃতির অজানা রহস্য আমাদের জন্য কত কিছু অপেক্ষা করে আছে, এই গবেষণাটি তারই একটি উদাহরণ। একটি সাধারণ ব্যাঙের শরীর থেকে পাওয়া ব্যাকটেরিয়া হয়তো একদিন ক্যান্সার রোগীদের জন্য নতুন আশা নিয়ে আসতে পারে। তবে যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতি চূড়ান্তভাবে মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হতে আরও সময় লাগবে।

ততদিন পর্যন্ত, ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতন থাকুন। স্বাস্থ্যকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। যদি কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখতে পান, যেমন মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া বা পেটে ব্যথা, তবে দেরি না করে একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মনে রাখবেন, এই ব্লগটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য। কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

Share this article: