জ্বর এলে প্রথমে কী করবেন?
জ্বর মানেই যে ডেঙ্গু বা টাইফয়েড, তা নয়। বাংলাদেশে জ্বরের অনেক কারণ থাকতে পারে। সাধারণ ভাইরাল জ্বর, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড- এগুলোর লক্ষণ অনেকটা একই রকম দেখালেও চিকিৎসা কিন্তু আলাদা। তাই জ্বর এলে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সঠিকভাবে বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে ভালো হয়, জ্বর শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। তবে এর আগে আপনি কিছু সাধারণ বিষয় লক্ষ্য রাখতে পারেন, যা ডাক্তারকে সঠিক রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করবে।
কোন জ্বর কোন রোগের লক্ষণ?
প্রতিটি রোগের জ্বরের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। নিচে সেগুলো সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
১. সাধারণ ভাইরাল জ্বর
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত ঠান্ডা লাগা, গলা ব্যথা, কাশি, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা নিয়ে আসে। জ্বর ১০০ থেকে ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। এটি সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনে নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়।
২. ডেঙ্গু জ্বর
ডেঙ্গু হলে হঠাৎ করেই খুব উচ্চ তাপমাত্রায় (১০৩-১০৫ ডিগ্রি) জ্বর আসে। সাথে থাকে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, বিশেষ করে কোমর ও হাড়ে ব্যথা। অনেক সময় শরীরে লালচে র্যাশ বা দাগ দেখা যায়। জ্বর কমে গেলেও রোগী খুব দুর্বল বোধ করে।
৩. চিকুনগুনিয়া
চিকুনগুনিয়ার জ্বর ডেঙ্গুর মতোই হঠাৎ আসে, তবে এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জয়েন্টে তীব্র ব্যথা। হাত-পা, হাঁটু, কোমর- সব জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে এবং এই ব্যথা অনেক দিন, এমনকি মাসের পর মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। সাথে জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি থাকে।
৪. টাইফয়েড
টাইফয়েডের জ্বর সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়ে। প্রথমে হালকা জ্বর (১০০-১০১ ডিগ্রি) থাকে, তারপর প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সাথে থাকে পেট ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, মাথাব্যথা, খিদে কমে যাওয়া। অনেক সময় জ্বরের সাথে সাথে রোগী খুব ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কোন টেস্ট করাবেন?
জ্বরের ধরন বুঝতে কিছু পরীক্ষা করা হয়। তবে মনে রাখবেন, সব জ্বরে সব টেস্ট লাগে না। চিকিৎসক লক্ষণ দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখে দেবেন। সাধারণত যে পরীক্ষাগুলো করা হয়:
- সিবিসি (CBC): রক্তের বিভিন্ন উপাদান যেমন শ্বেতকণিকা, অণুচক্রিকা (প্লেটলেট) ইত্যাদি মাপা হয়। ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে যেতে পারে, তাই এই টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ।
- ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন: জ্বর শুরু হওয়ার প্রথম ৫ দিনের মধ্যে এই টেস্ট করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
- ডেঙ্গু আইজিএম/আইজিজি অ্যান্টিবডি: জ্বরের ৫ দিন পরে এই টেস্ট করা হয়।
- চিকুনগুনিয়া আইজিএম: চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে এই টেস্ট করা হয়।
- টাইফয়েড (Widal test বা Blood Culture): টাইফয়েড নির্ণয়ে উইডাল টেস্ট বা রক্ত কালচার করা হয়।
- ম্যালেরিয়া পরীক্ষা: জ্বরের কারণ ম্যালেরিয়াও হতে পারে, তাই অনেক সময় এই টেস্টও করা হয়।
মনে রাখবেন, শুধু টেস্টের ফলাফল দেখে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না। টেস্টের ফলাফল নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
জ্বর সাধারণত ২-৩ দিনে নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি। যেমন:
- জ্বর ১০৩ ডিগ্রির বেশি হলে বা ৩ দিনের বেশি থাকলে
- জ্বরের সাথে সাথে তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে
- জ্বর কমে গেলেও রোগী খুব দুর্বল, অজ্ঞান বা অসংলগ্ন আচরণ করলে
- পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, বমি বা পাতলা পায়খানা হলে
- প্রস্রাব কমে গেলে বা রক্তপাতের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে
- শিশু, গর্ভবতী নারী বা বয়স্কদের জ্বর হলে
এই উপসর্গগুলো গুরুতর জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে, তাই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘরোয়া যত্ন ও প্রতিরোধ
জ্বর কমাতে ও রোগ প্রতিরোধে কিছু ঘরোয়া ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, এগুলো কোনো চিকিৎসা নয়, শুধু আরাম দিতে সাহায্য করে।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং প্রচুর পানি, ডাবের পানি, স্যালাইন, ফলের রস পান করুন।
- হালকা গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন, তবে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা থেকে বিরত থাকুন।
- ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে মশারি ব্যবহার করুন, বাসার আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন।
- টাইফয়েড প্রতিরোধে খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন, বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
- বাইরের খাবার, বিশেষ করে কাটা ফল ও খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন।
জ্বর হলে কিন্তু একদমই অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড নিজে থেকে খাবেন না। এটি পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সবশেষে
জ্বর একটি সাধারণ সমস্যা, কিন্তু এর পেছনে গুরুতর কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই জ্বরকে হালকাভাবে নেবেন না। সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা করলে ডেঙ্গু, টাইফয়েড, চিকুনগুনিয়া- সবই ভালো হয়ে যায়। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকুন, এবং জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।