কুকুর বা বিড়ালে কামড় দিলে প্রথমেই যা করবেন
কুকুর বা বিড়ালের কামড় খুব সাধারণ ঘটনা, কিন্তু এটা নিয়ে অবহেলা করা ঠিক না। কামড়ের মাধ্যমে র্যাবিস (Rabies) বা টিটেনাসের মতো রোগ ছড়াতে পারে। তাই প্রথমেই ঠান্ডা মাথায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিন।
- ক্ষত স্থান সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন: কামড়ের পরপরই ১০-১৫ মিনিট ধরে সাবান (soap) ও চলমান পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। এতে জীবাণু কিছুটা কমে যাবে।
- অ্যান্টিসেপটিক লাগান: ধোয়ার পর পোভিডন-আয়োডিন (povidone-iodine) বা অ্যালকোহল (alcohol) দিয়ে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করুন।
- রক্তপাত বন্ধ করুন: যদি বেশি রক্তপাত হয়, তবে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চেপে ধরুন।
- ব্যান্ডেজ করুন: ক্ষত স্থানটি জীবাণুমুক্ত ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
মনে রাখবেন, কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। নিজে নিজে ঘরোয়া টোটকা না করে সরাসরি ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
র্যাবিস টিকা (Rabies Vaccine) কখন নেবেন
র্যাবিস একটি মারাত্মক রোগ, যা একবার হলে প্রায় ১০০% মৃত্যু হয়। তাই কুকুর বা বিড়ালে কামড় দিলে র্যাবিস টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, কামড়ের দিনই প্রথম ডোজ (dose) নিতে হবে। সাধারণত ৪টি ডোজ দেওয়া হয়: ০, ৩, ৭, এবং ১৪তম দিনে। তবে ডাক্তার ক্ষতের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।
টিকা নেওয়ার সময় কিছু বিষয় মনে রাখুন:
- কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব টিকা নিন, আদর্শভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
- টিকা নিতে দেরি করলে র্যাবিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- গর্ভবতী বা শিশু হলেও টিকা নেওয়া নিরাপদ।
- টিকার পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করুন, মাঝপথে বাদ দেবেন না।
যদি কামড়ানো প্রাণীটি পোষা হয় এবং তার টিকা দেওয়া আছে, তবে ডাক্তার হয়তো কম ডোজ দিতে পারেন। কিন্তু নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি না নিয়ে সম্পূর্ণ কোর্স নেওয়াই ভালো।
ক্ষতের ধরন অনুযায়ী করণীয়
কামড়ের ধরন বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিন ধরনের ক্ষত হতে পারে:
- সারফেস ক্ষত (Surface wound): যদি চামড়া ছিড়ে না যায়, শুধু দাগ লাগে, তবে সাবান দিয়ে ধুয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- গভীর ক্ষত (Deep wound): যদি চামড়া ফেটে যায় বা রক্তপাত হয়, তবে দ্রুত হাসপাতালে যান।
- মুখ, চোখ বা যৌনাঙ্গে কামড়: এ ধরনের ক্ষত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখান।
মনে রাখবেন, ক্ষত যত গভীর, র্যাবিস ছড়ানোর ঝুঁকি তত বেশি। তাই ক্ষতের গুরুত্ব বুঝে ব্যবস্থা নিন।
পোষা কুকুর বা বিড়ালের টিকা (Pet Vaccination)
আপনার পোষা কুকুর বা বিড়ালকে নিয়মিত টিকা দেওয়া খুবই জরুরি। এতে শুধু আপনার পোষা প্রাণীই সুরক্ষিত থাকবে না, আপনার পরিবারও নিরাপদ থাকবে।
বাংলাদেশে পোষা প্রাণীর জন্য র্যাবিস টিকা সহজলভ্য। সাধারণত বছরে একবার করে টিকা দিতে হয়। টিকা দেওয়ার সময় পশু ডাক্তারের (Veterinarian) পরামর্শ নিন।
যদি আপনার পোষা প্রাণীকে টিকা দেওয়া থাকে, তবুও কামড় দিলে অবহেলা করবেন না। কারণ টিকা দেওয়া প্রাণীর কামড়েও ঝুঁকি থাকতে পারে।
কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে কী কী পরীক্ষা করতে হবে
সাধারণত কামড়ের পর র্যাবিস টিকা দেওয়া হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে বলতে পারেন:
- টিটেনাস টিকা (Tetanus vaccine): যদি আপনার টিটেনাস টিকা ৫ বছরের বেশি আগে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে ডাক্তার বুস্টার ডোজ দিতে পারেন।
- ক্ষতের কালচার (Wound culture): যদি ক্ষত স্থানে ইনফেকশন হয়, তবে ডাক্তার ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষার জন্য কালচার করতে বলতে পারেন।
- রক্ত পরীক্ষা (Blood test): কিছু ক্ষেত্রে র্যাবিস অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়, তবে সাধারণত কামড়ের পর নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার দরকার হয় না।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা ডাক্তারই নির্ধারণ করবেন। তাই নিজে থেকে কোনো পরীক্ষা করানোর দরকার নেই।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
কামড়ের পর নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান:
- ক্ষত স্থান থেকে পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হয়।
- চারপাশে লালভাব, ফোলাভাব বা তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
- জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা হয়।
- কামড়ানো প্রাণীটি বন্য বা অজানা, এবং ধরা যায়নি।
- কামড়ের পর প্রাণীটি অসুস্থ বা মারা যায়।
এছাড়া যদি কামড়ের পর ১৪ দিনের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন গলায় খিঁচুনি, পানি দেখলে ভয়, বা অস্বাভাবিক আচরণ, তবে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে যান।
বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা ও সহায়তা
বাংলাদেশ সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (Directorate General of Health Services) র্যাবিস প্রতিরোধে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে র্যাবিস টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কামড়ের পর নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে বিনামূল্যে টিকা পেতে পারেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী, কামড়ের পর অবশ্যই ক্ষত ধুয়ে ফেলতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিতে হবে। এছাড়া কামড়ানো প্রাণীটি যদি বন্য হয়, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে র্যাবিস নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে, যেমন কুকুরকে টিকা দেওয়া এবং কামড়ের পর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তাই কামড় পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক চিকিৎসা নিন।
সতর্কতা ও পরামর্শ
কামড় এড়াতে কিছু সতর্কতা মেনে চলুন:
- অচেনা বা বন্য কুকুর-বিড়াল থেকে দূরে থাকুন।
- পোষা প্রাণীকে উত্যক্ত করবেন না।
- খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর সময় প্রাণীকে বিরক্ত করবেন না।
- শিশুদের প্রাণীকে একা ছেড়ে দেবেন না।
- প্রাণীর টিকা নিয়মিত দিন।
সবশেষে, কামড় পড়লে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। র্যাবিস প্রতিরোধে টিকাই একমাত্র কার্যকর উপায়। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।