স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?
স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা অবস্থা, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে সমস্যা হলে ঘটে। সাধারণত মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে (ইসকেমিক স্ট্রোক) বা রক্তনালী ফেটে গেলে (হেমোরেজিক স্ট্রোক) মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না, ফলে তারা মারা যেতে শুরু করে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে স্ট্রোক একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মতো ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো কী কী?
স্ট্রোকের লক্ষণ হঠাৎ দেখা দেয়। এগুলো মনে রাখার সহজ উপায় হলো FAST পদ্ধতি:
- F (Face) - মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাসতে গেলে মুখ বাঁকা হয়ে যাওয়া।
- A (Arm) - এক হাত বা পা দুর্বল লাগা, উঠাতে না পারা।
- S (Speech) - কথা বলতে সমস্যা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা।
- T (Time) - সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
এছাড়াও অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো।
- হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, বিশেষ করে কোনো কারণ ছাড়া।
- এক চোখ বা দুই চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টি সমস্যা।
- মুখ বা শরীরের এক পাশে অসাড়তা বা দুর্বলতা।

যদি এই লক্ষণগুলোর কোনো একটি হঠাৎ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। মনে রাখবেন, প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।
বেলি পালসি (Bell's Palsy) কী? এটি কি স্ট্রোক?
অনেক সময় মুখের এক পাশ দুর্বল বা বাঁকা হলে মানুষ ভয়ে পড়ে যান যে এটি স্ট্রোক হয়েছে। কিন্তু এটি বেলি পালসি নামে আরেকটি সমস্যা হতে পারে। বেলি পালসি হলো মুখের স্নায়ু (ফেসিয়াল নার্ভ) প্রদাহের কারণে মুখের এক পাশের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া।
বেলি পালসি এবং স্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য হলো:
- বেলি পালসিতে সাধারণত শুধু মুখের এক পাশ দুর্বল হয়, কিন্তু হাত বা পায়ে দুর্বলতা থাকে না।
- স্ট্রোকে মুখের পাশাপাশি শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হতে পারে, কথা বলতে সমস্যা হতে পারে।
তবে এই পার্থক্য সবসময় স্পষ্ট নয়। তাই মুখের কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বেলি পালসি সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বা মাসে ভালো হয়ে যায়, তবে সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
স্ট্রোক হলে করণীয় কী?
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত কাজ করুন:
- সাথে সাথে জরুরি নম্বরে (যেমন ৯৯৯) ফোন করুন অথবা নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
- রোগীকে শুইয়ে রাখুন, মাথা একটু উঁচু করে দিন।
- রোগীকে কিছু খেতে বা পান করতে দেবেন না।
- রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে পাশ ফিরিয়ে দিন।
- রোগীকে একা রাখবেন না, পাশে থাকুন।
- অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়াবেন না, বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দেবেন না।
মনে রাখবেন, স্ট্রোকের চিকিৎসা নির্ভর করে লক্ষণ শুরু হওয়ার সময়ের উপর। যত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো যায়, তত ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
স্ট্রোক নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা করা হয়?
হাসপাতালে ডাক্তার রোগীর অবস্থা দেখে এবং কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোক নিশ্চিত করেন। সাধারণত যেসব পরীক্ষা করা হয়:
- শারীরিক পরীক্ষা - ডাক্তার রোগীর স্নায়বিক অবস্থা, রিফ্লেক্স, পেশির শক্তি, সমন্বয় ইত্যাদি পরীক্ষা করেন।
- সিটি স্ক্যান - মস্তিষ্কের ছবি তোলা হয়, যা রক্তক্ষরণ বা রক্তনালী বন্ধ হওয়া শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
- এমআরআই - আরও বিস্তারিত ছবি দেয়, যা স্ট্রোকের ধরন ও অবস্থান নির্ধারণে সহায়ক।
- রক্ত পরীক্ষা - রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, জমাট বাঁধার সময় ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।
- ইসিজি - হার্টের ছন্দের সমস্যা থাকলে তা শনাক্ত করতে।
- ক্যারোটিড আল্ট্রাসাউন্ড - ঘাড়ের রক্তনালীতে ব্লক থাকলে তা দেখতে।
ডাক্তার রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো নির্ধারণ করবেন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
স্ট্রোকের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। এমনকি লক্ষণগুলো কয়েক মিনিট পর ঠিক হয়ে গেলেও (যাকে ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক বা মিনি স্ট্রোক বলা হয়), এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই উপেক্ষা না করে চিকিৎসার পরামর্শ নিন।
যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য কিছু সহজ পদক্ষেপ নিতে পারেন:
- নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন এবং নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান বন্ধ করুন।
- স্বাস্থ্যকর খাবার খান, যেমন শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, এবং কম লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার।
- নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন (প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট)।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- কোলেস্টেরল ও রক্তে চর্বির মাত্রা পরীক্ষা করুন।
এই অভ্যাসগুলো মেনে চললে স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্ট্রোক একটি জরুরি অবস্থা, কিন্তু সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে অনেক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। লক্ষণগুলো মনে রাখুন, সময়মতো ব্যবস্থা নিন, এবং সুস্থ জীবনযাপন করুন। আপনার ও আপনার পরিবারের সুস্থতা কামনা করি।