টেস্ট টিউব বেবি কী?
টেস্ট টিউব বেবি শব্দটা শুনলে অনেকের মনে হয়, বাচ্চা হয়তো একটা কাচের টিউবের মধ্যে বড় হয়। আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। টেস্ট টিউব বেবি হলো আইভিএফ বা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের ফল। এই পদ্ধতিতে মায়ের শরীরের বাইরে, একটা ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু আর শুক্রাণুকে একত্রিত করা হয়।
প্রথমে মায়ের ডিম্বাণু এবং বাবার শুক্রাণু সংগ্রহ করা হয়। তারপর ল্যাবরেটরিতে এই দুটোকে মিলিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। ভ্রূণ তৈরি হয়ে গেলে সেটি আবার মায়ের জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়। এরপর স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার মতোই বাচ্চা বড় হয়।
অর্থাৎ, নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়াটা শুধু শরীরের বাইরে ঘটে, বাকি সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই হয়। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কেন টেস্ট টিউব বেবির প্রয়োজন হয়?
অনেক দম্পতিই চেষ্টা করেও সন্তান পান না। এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। টেস্ট টিউব বেবি বা আইভিএফ সেই ক্ষেত্রেই একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
- ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকলে: মায়ের ফ্যালোপিয়ান টিউব যদি ব্লক থাকে, তাহলে ডিম্বাণু আর শুক্রাণু মিলতে পারে না। আইভিএফ-এ এই সমস্যা এড়ানো যায়।
- পুরুষের শুক্রাণুর সমস্যা: শুক্রাণুর সংখ্যা কম, গঠন অস্বাভাবিক বা চলাচলে সমস্যা থাকলে স্বাভাবিকভাবে সন্তান হওয়া কঠিন। আইভিএফ-এ ল্যাবে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়।
- বয়সজনিত সমস্যা: মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ডিম্বাণুর মান কমে যায়। আইভিএফ-এ ভালো ডিম্বাণু বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
- অনিয়মিত ডিম্বাণু নিঃসরণ: যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস-এ ডিম্বাণু ঠিকমতো বের হয় না। আইভিএফ-এ ওষুধ দিয়ে ডিম্বাণু তৈরি করা হয়।
- অজানা কারণ: অনেক সময় সব পরীক্ষা করেও বন্ধ্যাত্বের কারণ বোঝা যায় না। তখনও আইভিএফ একটি ভালো বিকল্প।
টেস্ট টিউব বেবির জন্য কী কী প্রয়োজন?
আইভিএফ শুরু করার আগে কিছু প্রস্তুতি দরকার। প্রথমেই দম্পতির উভয়েরই কিছু পরীক্ষা করতে হবে।
মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
- রক্ত পরীক্ষা এবং হরমোন পরীক্ষা
- আল্ট্রাসাউন্ড করে ডিম্বাশয়ের অবস্থা দেখা
- জরায়ুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা
বাবার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
- শুক্রাণু পরীক্ষা বা সেমেন অ্যানালাইসিস
- রক্ত পরীক্ষা
এছাড়া, দম্পতির বয়স, স্বাস্থ্যের ইতিহাস এবং আগের কোনো চিকিৎসার কথা ডাক্তারকে জানাতে হবে। ডাক্তার সবকিছু দেখে একটি পরিকল্পনা তৈরি করবেন।
কীভাবে শুরু করবেন?
টেস্ট টিউব বেবি শুরু করার জন্য প্রথমে আপনাকে একজন ভালো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
কোন ধরনের ডাক্তারের কাছে যাবেন?
আপনাকে একজন গাইনোকোলজিস্ট বা বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ (ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট) এর কাছে যেতে হবে। বাংলাদেশে অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। যারা আইভিএফ-এ অভিজ্ঞ, এমন ডাক্তার বেছে নেওয়া জরুরি।
প্রথম ধাপ
প্রথমে ডাক্তারের সাথে কথা বলে আপনার অবস্থা বুঝিয়ে বলুন। ডাক্তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করবেন এবং আপনার জন্য কোন পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো, তা নির্ধারণ করবেন।
চিকিৎসার ধাপগুলো
- ওষুধ দিয়ে ডিম্বাণু তৈরি: মাকে কিছু ইনজেকশন বা ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে একাধিক ডিম্বাণু তৈরি হয়।
- ডিম্বাণু সংগ্রহ: আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে ডিম্বাণুগুলো বের করে আনা হয়। এটি ছোট একটি প্রক্রিয়া।
- শুক্রাণু সংগ্রহ: বাবার কাছ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা হয়।
- ভ্রূণ তৈরি: ল্যাবে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু মিলিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।
- ভ্রূণ স্থানান্তর: ৩ থেকে ৫ দিন পর ভ্রূণটি মায়ের জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।
এরপর ২ সপ্তাহ পর গর্ভাবস্থার পরীক্ষা করা হয়।
সতর্কতা এবং পরামর্শ
টেস্ট টিউব বেবি একটি নিরাপদ পদ্ধতি, তবে এটি সবসময় সফল নাও হতে পারে। অনেকের একবারেই সফল হয়, আবার কারও কারও একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়।
এই চিকিৎসা শুরু করার আগে ডাক্তারের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। খরচ, সফলতার হার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানুন। মনে রাখবেন, প্রতিটি রোগীর অবস্থা আলাদা, তাই সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
সবশেষে, এই পথে হাঁটার সময় ধৈর্য রাখুন এবং একে অপরকে সহযোগিতা করুন। চিকিৎসার সময় মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন। আপনার ডাক্তারের পরামর্শ মতো চলুন, আর প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নিতেও দ্বিধা করবেন না।
দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।